বীরভূমের গ্রাম থেকে দিল্লি দরবার, এক অকল্পনীয় যাত্রা।

প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, দিল্লির সেনা হাসপাতালে জীবনাবসান, বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

Webdesk,:  ইন্দিরাজি বলতেন, 'প্রণবকে কোনো গোপন তথ্য জানানো হলে নিশ্চিত থেকো ওঁর পেট থেকে তা কখনো বেরবে না। শুধু যেটা বেরিয়ে আসবে, তা হল ওঁর পাইপের ধোঁয়া'।"
ভারতীয় রাজনীতি এবং প্রশাসনিক জগতে একটি অধ্যায় সমাপ্ত হল। প্রয়াত হলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। মৃত্যুকালে প্রাক্তন প্রথম নাগরিকের বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। সেনা হাসপাতালে তাঁর ব্রেন টিউমারে অস্ত্রোপচার হয়েছিল। এরপর থেকে ভেন্টিলেশনেই ছিলেন কোমাচ্ছন্ন করোনা আক্রান্ত প্রণববাবু প্রণব মুখোপাধ্য়ায়ের প্রয়াণের খবর টুইটারে জানান তাঁর পুত্র অভিজিত মুখোপাধ্য়ায়।

বীরভূমের মিরাটি গ্রামের মুখোপাধ্যায় পরিবারের ছোট ছেলে প্রায় সাড়ে চার দশকের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাত বার (পাঁচ বার রাজ্যসভা ও দুই বার লোকসভা মিলিয়ে) সাংসদ হয়েছেন। এছাড়া, কেন্দ্রের বিভিন্ন সরকারে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক সামলানোর পাশাপাশি অধিকাংশ মন্ত্রিগোষ্ঠীর শীর্ষ দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। এরপর ২০১২ সালে ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি হিসাবে রাইসিনা হিলের রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রবেশ করেন প্রণববাবু।
১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর এবং ২০০৪ সালে সোনিয়া গান্ধি প্রধানমন্ত্রী পদ প্রত্যাখ্যান করায় দু’বার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ এসেছিল প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সামনে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ বাস্তবে রূপান্তরিত হয়নি। কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী না হলেও কংগ্রেস দলে এবং কেন্দ্রীয় সরকারে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ প্রণব।
আগাগোড়া কংগ্রেসি ঘরানার প্রণব মুখোপাধ্যায় স্বল্প সময়ের জন্য জাতীয় কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। ১৯৮৬ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে বছর তিনেক পরই সেই দল কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যায়।
বাংলা কংগ্রেসের সাংসদ হয়ে রাজ্যসভায় যাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সুনজরে পড়েন তরুণ প্রণব। এর কয়েক বছর পর বাংলা কংগ্রেস মূল কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যায়। ততদিনে প্রণববাবুও হয়ে উঠেছেন ইন্দিরা গান্ধীর অত্যন্ত আস্থাভাজন।
জরুরি অবস্থাই হোক অথবা কংগ্রেসের ভাঙন, বরাবরই ইন্দিরার সঙ্গে থেকেছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তবে ইন্দিরা হত্যার পরই প্রণবের কঠিন সময় শুরু। রাজীব গান্ধী প্রণববাবুকে কোণঠাসা করে প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে সফল হওয়ার পরই রাজনীতিতে ‘খারাপ সময়ে’র মধ্যে পড়েন কীর্ণাহারের ব্রাহ্মণ সন্তানটি। এই তিক্ততা চরমে পৌঁছয় ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর। এই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে রাজীবের সরকার। তবে সেখানে ঠাঁই হয়নি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের। এরপরই চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন প্রণব। কংগ্রেসের সঙ্গে দীর্ঘকালের সম্পর্ক ছিন্ন করে পৃথক দল গড়েন তিনি। তবে বছর তিনেক পরেই আবার ফিরে এসেছিলেন পুরানো রাজনৈতিক পরিবারে।
রাজীব হত্যার পর নরসিমা রাও প্রধানমন্ত্রী হন। তখন যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানের পদে আসীন হন প্রণব মুখোপাধ্যায়। এরপর ১৯৯৫ সালে ভারতের বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন প্রণববাবু।
১৯৯৭ সালে সোনিয়া গান্ধি কংগ্রেস সদস্য হওয়ার এক বছর পরেই সভানেত্রী হন। জানা যায়, সোনিয়ার এই উত্তোরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।
ডঃ মনমোহন সিং-এর সরকারে, প্রণব মুখার্জি ছিলেন কার্যত দ্বিতীয় ব্যক্তি। ৯৫টিরও বেশি মন্ত্রিগোষ্ঠী এবং ক্ষমতাসম্পন্ন মন্ত্রীগোষ্ঠীর চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। তিনজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেছেন- ইন্দিরাজি, নরসিমা রাও এবং ডঃ মনমোহন সিং। তিনিই দেশের একমাত্র অর্থমন্ত্রী যিনি ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক সংস্কারের আগে এবং পরে বাজেট পেশ করেছেন। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে তাঁর বলিষ্ঠ পদক্ষেপেই রক্ষা পেয়েছে ভারতের অর্থনীতি।
নরেন্দ্র মোদী যখন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন, তখন পাশে দাঁড়িয়ে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। ২০১৮ সালে রাষ্ট্রপতি হিসাবে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হিসাবে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রণববাবু। আরএসএস-এর অনুষ্ঠানে তাঁর এই উপস্থিতি প্রবল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে কংগ্রেসের অন্দরে, এমনকি প্রণব-কন্যা শর্মিষ্ঠাও বাবার এই সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি।
চলতি বছরের গোড়ার দিকে যখন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং প্রস্তাবিত নাগরিকপঞ্জি নিয়ে বিতর্ক চরমে পৌঁছেছে তখনই মুখ খোলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “অন্যের কথা শোনা, বিতর্ক এবং ভিন্নমতের মধ্যে দিয়েই উন্নতি করে গণতন্ত্র” এবং ‘বর্তমান সময়ের এই ঢেউ’ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথ অনুসরণ করলে তা ভারতীয় গণতন্ত্রের শিকড়কে আরও সুদৃঢ় করবে।


Comment As:

Comment (0)